মঙ্গলবার , ২৬ সেপ্টেম্বর ২০১৭
Home » অর্থনীতি » উপকূলের নতুন অর্থনীতি কাঁকড়া চাষ

উপকূলের নতুন অর্থনীতি কাঁকড়া চাষ

২০১৫-১৬ অর্থ বছরে রপ্তানী আয় ২৫০ মিলিয়ন টাকা

সিনিউজ: উপকূলের অর্থনীতির নতুন সাদা সোনা এখন কাঁকড়া। সেখানে চিংড়ির পর এই হোয়াইট গোল্ড থেকে আসছে বৈদেশিক মুদ্রা। ২০১৫-১৬ অর্থবছরে কাঁকড়া থেকে আয় হয়েছে ২৫০ মিলিয়ন টাকা। গোটা উপকূল আর সুন্দরবনজুড়ে চাষ ও আহরণ হচ্ছে কাঁকড়া। প্রাকৃতিক উৎস থেকে আহরণের পাশাপাশি কাঁকড়া এখন চাষ হচ্ছে। এতে লাভবান হচ্ছে কাঁকড়া চাষীরা। আসছে কাক্সিক্ষত বৈদেশিক মুদ্রা।
খুলনা অঞ্চলে স্বল্প জায়গায় বিজ্ঞানসম্মতভাবে কাঁকড়া চাষ এখন মডেল। বিদেশের বাজারে চাহিদা বৃদ্ধি পাওয়ায় বৃহত্তর খুলনা অঞ্চলের চিংড়িচাষীরা এখন ঝুঁকেছেন কাঁকড়া চাষেও। ফলে গুরুত্ব পাচ্ছে অবহেলিত এই কৃষি।
গবেষক মো. ইনামুল হক বলেন, কাঁকড়া উৎপাদনে কাক্সিক্ষত লক্ষ্যে  পৌঁছানো সম্ভব হচ্ছে না পর্যাপ্ত পোনার অভাবে। কারণ পোনার জন্য ভরসা প্রাকৃতিক উৎস। চাষিদের এই চাহিদা মেটাতে কৃত্রিম প্রজননে পোনা উৎপাদনের গবেষণা শুরু করি। তিনি বলেন, হ্যাচারিতে কাঁকড়ার পোনা উৎপাদন অপেক্ষাকৃত নতুন প্রযুক্তি। এ ক্ষেত্রে মূল বাধা হলো পোনা বাঁচার হার কম। একটি পরিপক্ক কাঁকড়ার ডিম দেয়ার ক্ষমতা ৮০ হাজার থেকে সর্বোচ্চ ৪০ লাখ। কিন্তু পোনা বাঁচার হার গড়ে ১০ শতাংশ। গবেষক দল হ্যাচারিতে তিনটি পরিপক্ক মা কাঁকড়া সংরক্ষণ করে প্রায় ৩২, ১৬ ও ২৬ লাখ ‘জুইয়া’ পান। তা পূর্ণাঙ্গ পোনায় পরিণত হতে আরও ছয়টি ধাপ অতিক্রম করতে হয়। এ ক্ষেত্রে আমরা সফল হয়েছি। এখন বাণিজ্যিকভাবে কাঁকড়ার পোনা উৎপাদনের প্রক্রিয়া চলছে।
কাঁকড়া মৌসুম শুরু হয় বর্ষার পরপর। বৃহত্তর খুলনা অঞ্চলে চিংড়ি ঘেরেই কাঁকড়া চাষ হচ্ছে। এর পাশপাশি শক্ত জাল ও তার চারপাশে পানির ভেতর বাঁশের চটা দিয়ে পাটা তৈরি করে খাঁচার মধ্যে কাঁকড়া চাষ শুরু হয়েছে। এভাবে খাঁচায় কাঁকড়া চাষ করে অনেকেই সুফল পাচ্ছে। খুলনার বটিয়াঘাটার কাঁকড়াচাষী হরিদাস ম-ল গত তিন বছরে কাঁকড়া চাষ করে প্রায় ১০ লক্ষাধিক টাকা উপার্জন করেছেন। সফলতা অর্জন করেছেন হালিয়া গ্রামের কমলেশ বালা, নোয়াইল তলার জাকির, সুরখালীর আসাফুর মাস্টার, কয়রার কামাল শেখ, পাইকগাছার নরেশ ম-ল প্রমুখ। গত ৫-৬ বছর স্থানীয়ভাবে গড়ে ওঠেছে কাঁকড়ার হ্যাচারি নামে খ্যাত ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র কাঁকড়া প্রজনন প্রকল্প যা কাঁকড়া চাষে যোগ করছে নতুন মাত্রা।
প্রাকৃতিকভাবে সুন্দরবনের অসংখ্য নালা, খাল, সমুদ্র জলসীমা ও মোহনা থেকে কাঁকড়া আহরণ চলছে। গতবছর জলদস্যুদের উৎপাতে এ কাজ বাধাগ্রস্ত হয়। কিন্তু এ বছর আহরণ অনেক বাড়বে বলে আশা করছেন সংশ্লিষ্ট চাষী, বন বিভাগ ও প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর।
প্রয়োজনীয় উদ্যোগ, আধুনিক পদ্ধতি ও আহরণকারীদের পর্যাপ্ত নিরাপত্তার অভাবে সরকার প্রতি বছর এ খাত থেকে কয়েকশ’ কোটি টাকার বৈদেশিক মুদ্রা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, সম্ভাবনাময় এই জলজসম্পদকে সঠিকভাবে কাজে লাগাতে পারলে এটাও হতে পারে দারিদ্র্য বিমোচনের অন্যতম হাতিয়ার।
সংশ্লি¬ষ্ট সূত্র জানায়, প্রতি বছর আন্তর্জাতিক বাজারে কাঁকড়ার চাহিদা বৃদ্ধির পাশাপাশি দামও বাড়ছে। তবে জলদস্যুদের উৎপাতে কাঁকড়া আহরণ মৌসুমে সুন্দরবনের গভীর অংশ, হিরণ পয়েন্ট ও সমুদ্র পর্যন্ত তারা কাঁকড়া আহরণ করতে গিয়ে বাধাগ্রস্ত হয়। এবার এই সমস্যার সমাধান করা হয়েছে বলেন বনবিভাগ।
এছাড়া উপকূলীয় জেলা খুলনা, বাগেরহাট ও সাতক্ষীরা চিংড়ি ঘেরগুলোতে প্রাকৃতিকভাবেই কাঁকড়া উৎপাদিত হচ্ছে। সংশ্লি¬ষ্টদের মতে, সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা পেলে কাঁকড়া রপ্তানি করে আরো বেশি বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করা সম্ভব। জানা গেছে, স্থানীয় বাজারে প্রতি কেজি কাঁকড়ার দাম গ্রেড ভেদে ৩০০ থেকে ৫০০ টাকা।
সংশ্লিষ্ট সূত্র থেকে আরো জানা যায়, আমাদের দেশে ১৫ প্রজাতির কাঁকড়া রয়েছে। এর মধ্যে আন্তর্জাতিক বাজারে সিলা সেটরা কাঁকড়ার চাহিদা সবচেয়ে বেশি। এই কাঁকড়া সুন্দরবনে প্রচুর পরিমাণে পাওয়া যায়। প্রাকৃতিকভাবে উৎপাদিত যে কাঁকড়া ধরা পড়ে তা সঠিকভাবে প্রক্রিয়াজাত করে রপ্তানি এবং সরকারিভাবে ব্যাংক ঋণের সুবিধা দেয়া হলে উপকূলীয় জেলা ছাড়াও দেশের অর্থনীতির উন্নয়নে কাঁকড়া রপ্তানি বিরাট সাফল্য বয়ে আনবে।
মৎস্য অধিদপ্তর সূত্রে জানা যায়, আশির দশকের শুরুতে প্রথম অপ্রচলিত পণ্য হিসেবে কাঁকড়া বিদেশে রপ্তানি শুরু হয়। রপ্তানি ব্যুরো (ইপিবি) সূত্রে জানা যায়, ১৯৭৭-৭৮ অর্থবছরে বিদেশে প্রথম কাঁকড়া রপ্তানি করা হয়। এরপর রপ্তানি বন্ধ থাকে প্রায় তিন বছর। ১৯৮২-৮৩ অর্থবছরে আবার বিদেশে রপ্তানি করা হয়। পর্যায়ক্রমে আন্তর্জাতিক বাজারে এর চাহিদা বাড়তে থাকে। পাশাপাশি বাড়তে থাকে এ খাত থেকে বৈদেশিক মুদ্রায় আয়। ১৯৯০-৯১ সালে কাঁকড়া রপ্তানি করে আয় হয় ২৭ লাখ ৯৩ হাজার টাকা। এরপর ২০০১-০২ অর্থবছরের এ খাত থেকে আয় হয় প্রায় ৫৩ মিলিয়ন টাকা। আর ২০১৫-১৬ অর্থবছরে এই আয় গিয়ে দাঁড়ায় ২৫০ মিলিয়ন টাকায়।
কাঁকড়া আহরণের সবচেয়ে বড় ভা-ার সুন্দরবন। এখানে কাঁকড়া আহরণকারীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এবার বন বিভাগ ব্যাপকভাবে টহল জোরদার করেছে। সিএফ আমির হোসাইন বলেন, কাঁকড়া আহরণের বিষয়ে ইতোমধ্যে বন কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের দায়িত্ব পালনের জন্য বিশেষভাবে সর্তক করা হয়েছে। সম্ভাবনাময় এ শিল্পকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেয়া ও এর সঙ্গে জড়িত তৃণমূল পর্যায়ের শত শত কাঁকড়া আহরণকারীদের নিরাপত্তা নিশ্চিতের পাশাপাশি কোনো রকম যেন হয়রানি না হয় সে বিষয়ে সজাগ করা হয়েছে।
আধুনিক পদ্ধতিতে চাষ হচ্ছে কাঁকড়া,
রপ্তানির তালিকায় ধীরে ধীরে জায়গা করে নিচ্ছে উপকূলীয় এলাকার জলজ প্রাণী কাঁকড়া। লাভজনক ও মৃত্যুঝুঁকি না থাকায় কাঁকড়া চাষের দিকে ঝুঁকছে এ অঞ্চলের চাষীরা।
সরকারি পৃষ্ঠপোষকতায় প্রদর্শনী কাঁকড়া খামার স্থাপন হওয়ায় অনেক চাষী চিংড়ি চাষের পাশাপাশি কাঁকড়া চাষ করছেন। মৎস্য বিভাগ প্রদর্শনী খামারগুলোতে খাঁচায়, পেনে ও কিশোর নামের তিন ধরনের কাঁকড়া চাষে কারিগরি সহায়তা প্রদান করছে। বাগেরহাটের রামপাল, মংলা ও সদর উপজেলার বিভিন্ন এলাকার চাষীরা প্রশিক্ষণ নিয়ে লাভজনক এ চাষে এগিয়ে আসছেন।
রামপাল উপজেলার হুড়কা গ্রামের কাঁকড়াচাষী পবিত্র পাড়ে ও দ্বীপঙ্কর জানান, কয়েক বছর ধরে চিংড়িতে মড়ক ও ভাইরাস লাগায় অনেক ঘের মালিক আগ্রহ হারিয়ে ফেলেছেন। তবে কাঁকড়া চাষে এ ধরনের ঝুঁকি না থাকায় এ চাষ লাভজনক।
আরেক কাঁকড়াচাষী আনসার আলী বিশ্বাস জানান, তারা উপজেলা মৎস্য অফিস থেকে আধুনিক পদ্ধতিতে কাঁকড়া চাষের প্রশিক্ষণ নিয়ে অল্প জমিতে চাষ করে লাভবান হয়েছেন। ৫২ শতক জমিতে কাঁকড়া চাষ করে তিনগুণ মুনাফা পেয়েছেন। কাঁকড়া চাষে লাভজনক প্রদর্শনী খামার দেখে এলাকার অনেক চাষী আগ্রহী হয়ে উঠেছেন। বিশেষ করে খাঁচায় কাঁকড়া চাষ বেশি লাভজনক বলে জানান চাষীরা। আশপাশে দিন দিন বেড়ে চলেছে কাঁকড়ার খামার। বাগেরহাটের রামপালের হুড়কা, রামপাল সদরসহ কয়েকটি ইউনিয়নে নারী-পুরুষ মিলে কাঁকড়া চাষের কাজ করছেন।
রামপাল উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা জানান, এ এলাকার মাটি ও পানি কাঁকড়া চাষের জন্য উপযোগী হওয়ায় মৎস্য অধিদপ্তরের উদ্যোগে কাঁকড়া চাষ প্রকল্পের আওতায় প্রদর্শনী খামার স্থাপনের পর এক বছরের ব্যবধানে বর্তমানে চাষীর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে প্রায় ৯০০। আমরা ঘের প্রস্তুতি থেকে শুরু করে নানা ধরনের সহযোগিতা দিয়ে চাষীদের কাঁকড়া চাষে উদ্বুদ্ধ করছি। গত অর্থবছরে রামপাল উপজেলায় ৮৫০ মেট্রিক টন কাঁকড়া উৎপাদন হয়েছে। তবে চলতি অর্থবছরে এ উৎপাদন বেড়ে তিনগুণ ছাড়িয়ে যাবে বলে আশা করছেন তিনি।