সোমবার , ১১ ডিসেম্বর ২০১৭
Home » জাতীয় » অবনতির দিকে দেশের আর্সেনিক পরিস্থিতি

অবনতির দিকে দেশের আর্সেনিক পরিস্থিতি

Photo Arsenic

সিনিউজ:   ক্রমেই অবনতির দিকে যাচ্ছে দেশের আর্সেনিক পরিস্থিতি। ক্রমাগত ভূগর্ভস্থ পানি আহরণের ফলে বেড়ে যাচ্ছে আর্সেনিকের পরিমাণ। নলকূপ ও মোটরচালিত নলের পানির সঙ্গে এসব আর্সেনিক উঠে আসছে উপরে। অবিনাশী ক্ষমতাসম্পন্ন এসব আর্সেনিক মানবদেহসহ বিভিন্ন প্রাণীর মধ্যে প্রবেশ করে সৃষ্টি করছে মারাত্মক স্বাস্থ্য বিপর্যয়। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ও বেসরকারি সংস্থার প্রতিবেদন থেকে এ সব তথ্য জানা যায়।
আর্সেনিক এভাবে পরিবেশের ক্ষতি করলেও এ বিষয়ে আন্তর্জাতিক সহযোগিতার কোনো খবর আসছে না বিগত কয়েক বছরে। সরকারিভাবেও বাড়ানো হচ্ছে না কোনো তহবিল। তাই অবনতির দিকেই থেকে যাচ্ছে আর্সেনিক সমস্যা। দেশের প্রায় তিন কোটি মানুষ আর্সেনিক ঝুঁকিতে আছে বলে প্রতিবেদনে প্রকাশ করা হয়।
জাতিসংঘের তথ্য মতে, দেশে প্রায় ১২ লাখ সেচ পাম্পের মাধ্যমে বাংলাদেশে পানি ব্যবহৃত হয় ৮৮ শতাংশ চাষাবাদের জন্য, ১০ শতাংশ গৃহস্থালির কাজে এবং বাকি মাত্র ২ শতাংশ শিল্পখাতে।
দেশে প্রায় ১৩ লাখ অগভীর নলকূপসহ প্রায় ৫০ লাখ নলকূপের মাধ্যমে প্রতিদিন পানি উত্তোলন করা হচ্ছে। পৌরসভা ও মফস্বল শহর এলাকার বসতবাড়ি ও বাণিজ্যিক কাজে নলকূপগুলোর মুখে বিদ্যুৎচালিত মোটর বসিয়ে পানি উত্তোলনের পরিমাণকে আরও বহুগুণে বৃদ্ধি করা হচ্ছে। কিন্তু ভূ-উপরিস্থ প্রাকৃতিক জলাশয়ের পানি ব্যবহৃত হচ্ছে না। তাই বেড়েই যাচ্ছে আর্সেনিক ঝুঁকি।
স্বাস্থ্য অধিদফতরের তথ্য অনুযায়ী, প্রতিবছর আর্সেনিকোসিসের রোগী বাড়ছে। ২০০৮ সালে ছিল ২৪ হাজার ৩৮৯ জন। ২০১২ সালে ছিল ৬৫ হাজার ৯১০ জন। তবে গত পাঁচ বছরের হিসাব স্বাস্থ্য অধিদফতরে নেই।
এর আগে বিশ্ব পানি দিবস উপলক্ষে পানি বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছেন, দেশের প্রায় ৩ কোটি ৬০ লাখ মানুষ, যা মোট জনগোষ্ঠীর ২৬ ভাগ আর্সেনিকজনিত মারাত্মক স্বাস্থ্য ঝুঁকিতে আছে বলে। তারা বলেন, ভূগর্ভ থেকে বেশি পানি উত্তোলন করার ফলে আর্সেনিক দূষণ বিপর্যয় ডেকে আনছে। এনজিও ফোরাম, জাইকা, ইউনিসেফ, বিশ্বব্যাংক, ইউএনআইসি, স্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদফতর, বাংলাদেশ ওয়াশ এলাইন্স, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, সুইস এজেন্সিস ফর ডেভেলপমেন্ট অ্যান্ড কো-অপারেশন (এসডিসি) যৌথভাবে সম্প্রতি এক মিট দ্য প্রেসের আয়োজন করে।
মিট দ্য প্রেস এ জানানো হয়, সারাদেশে প্রায় ১৩ লাখ অগভীর নলকূপের মাধ্যমে ভূগর্ভস্থ পানি উত্তোলন করা হয়। অথচ ৮ লাখ নলকূপ ব্যবহার করাই এ কাজের জন্য যথেষ্ট। ফলে উত্তোলন কাজে ব্যবহৃত শক্তি সম্পদ ও উত্তোলিত পানি উভয়েরই অপচয় হচ্ছে।
উল্লেখ্য, ভূগর্ভস্থ পানি তোলার জন্য বাংলাদেশে সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত কলটির নাম চাপকল এবং সারাদেশে এ ধরনের নলকূপের সংখ্যা অন্তত ৫০ লাখ। বাসাবাড়িতে গৃহস্থালির কাজে ও পানের পানি উত্তোলনের কাজে ৬ নম্বর পাম্প ব্যবহার করা হয়। যে সব অঞ্চলের পানির স্তর নিচে সে সব স্থানে পানি তুলতে তারাপাম্প ব্যবহার করা হয়। এইসব নলের ব্যাস সাধারণত ৩.৮১ থেকে ৬.৩৫ সে.মি। ৫.০৮ থেকে ১০.১৬ সে.মি ব্যাসবিশিষ্ট শ্যালো টিউবওয়েল বা অগভীর নলকূপ প্রধানত সেচকার্যে ব্যবহৃত হয়। এছাড়া ১৫.২৪-২০.৩২ সে.মি ব্যাসের পাম্পকে গভীর নলকূপ বলে। মাটির নিচে প্রাকৃতিকভাবেই এই আর্সেনিক তৈরি হয় এবং তা ভূগর্ভস্থ পানির সঙ্গে মিশে যেতে পারে।
নিউইয়র্কভিত্তিক মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস ওয়াচ তাদের প্রকাশিত ‘নেপোটিসম্ এ্যান্ড নেগলেক্ট: দ্য ফেলিং রেসপন্স টু আর্সেনিক ইন দ্য ড্রিঙ্কিং ওয়াটার অফ বাংলাদেশেস রুরাল পুওর’ প্রতিবেদনে বলেছে, বাংলাদেশের প্রায় দুই কোটি মানুষ এখনও আর্সেনিক দূষিত পানি পান করছে। প্রতিবেদনে বিগত দুই দশকে এই সমস্যা সমাধানে মৌলিক পদক্ষেপগুলো নিতে সরকারকে ব্যর্থ হয়েছে।
মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস ওয়াচ মনে করছে, বাংলাদেশের গ্রামগুলোতে দরিদ্র মানুষ এখনও আর্সেনিকযুক্ত ভূগর্ভস্থ পানি পান করছে এবং বাংলাদেশ সরকার জনস্বাস্থ্যের ওপর আর্সেনিকের ঝুঁকি মূলত অগ্রাহ্য করছে। তারা মনে করছে, বাংলাদেশে এই আর্সেনিকযুক্ত পানি পান করে মৃত্যু ঘটছে ৪৩ হাজার মানুষের। তারা আরও বলেছে, বাংলাদেশের যেসব গ্রামাঞ্চলের অগভীর নলকূপের পানিতে বিষাক্ত আর্সেনিকের উপস্থিতি পাওয়া গেছে তাদের পানীয় জলের কোনো বিকল্প না থাকায় ১৯৯০ দশকের মাঝামাঝি সময় থেকে স্বাস্থ্য ঝুঁকি সত্ত্বেও তারা দূষিত পানি খেতে বাধ্য হচ্ছে।
তবে ২০২০ সালের মধ্যে ঝুঁকিতে থাকা মানুষের সংখ্যা শূন্যের কোঠায় নেমে আসবে বলে জানিয়েছে সরকারের একটি সূত্র। জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদফতরের তথ্য অনুযায়ী, আর্সেনিক সমস্যা নিরসনে বিশ্বব্যাংক, ইউনিসেফ, ডেনমার্কের আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সংস্থা, কানাডার দাতা সংস্থা সিডা এবং ইসলামিক উন্নয়ন ব্যাংকের আর্থিক সহায়তায় দেশব্যাপী সাতটি বড় প্রকল্প বাস্তবায়িত হয়। এছাড়া সরকারের নিজস্ব অর্থে একাধিক প্রকল্পও বাস্তবায়িত হয়। এসব প্রকল্পের মাধ্যমে আর্সেনিক প্রবণ অঞ্চলে ২ লাখ ১০ হাজার পানির উৎস স্থাপন (মূলত নলকূপ) ও বিকল্প পানি সরবরাহের ব্যবস্থা (পন্ডস এ্যান্ড স্যান্ড ফিল্টার) স্থাপন করা হয়েছিল। এসব উদ্যোগের পাশাপাশি সচেতনতা বৃদ্ধির প্রকল্পের ফলে আর্সেনিকজনিত অনিরাপদ পানির ব্যবহার কমে যায়।
তবে বিশিষ্ট পানি বিশেষজ্ঞরা পরিসংখ্যান দেখিয়ে বলেছেন, আর্সেনিক সমস্যা আগের মতোই আছে। এ জন্য সরকার যেমন তার দায়িত্বটি পালন করছেন না, তেমনি দাতাদের আগ্রহে ভাটা পড়ায় বেসরকারি সংস্থাগুলোও আর্সেনিক নিয়ে আর আগ্রহ দেখাচ্ছে না।
‘আর্সেনিক সমস্যা নিরসনে জাতীয় নীতিমালা, ২০০৪’-এ আর্সেনিক বিষয়ক যাবতীয় কর্মকা- তদারকির জন্য একটি উচ্চ পর্যায়ের কমিটি এবং সমস্যা নিরসনে জাতীয় পর্যায়ে একটি বিশেষজ্ঞ কমিটি গঠনের কথা বলা আছে। কিন্তু গত ১০ বছরে কমিটি দুটোর কোনো সভা হয়নি।