মঙ্গলবার , ২৬ সেপ্টেম্বর ২০১৭
Home » জাতীয় » শাপলা বিক্রি করে হাজার পরিবার জীবিকা নির্বাহ করছে

শাপলা বিক্রি করে হাজার পরিবার জীবিকা নির্বাহ করছে

DEHO-.22

সিনিউজ:  ভোরের আলো দেখা যায়নি। চারদিক অন্ধকার। ঠিক তখনি মাদারীপুরের বাঘিয়ার বিল ও গোপালগঞ্জের চান্দার বিল অঞ্চলের সহস্রাধিক দরিদ্র পরিবারের মানুষ জীবিকা নির্বাহের জন্য ছোট ছোট ডিঙি নৌকা নিয়ে নেমে পড়ে বিলের পানিতে। শুরু হয়, প্রকৃতিভাবে জন্ম নেওয়া শাপলা তোলার প্রতিযোগিতা। কে কত বেশি শাপলা তুলবে, কার ডিঙি নৌকা কত তাড়াতাড়ি ভরে যাবে, চলে এমন প্রতিযোগিতা। শুধু বড়রা নয় শিশুরাও পরিবারের সদস্যদের সাথে এসে শাপলা তোলার কাজে নেমে যায়।
ভোরের আলো চোখ মেলার কিছুক্ষণের মধ্যে পাইকারী ব্যবসায়িরা নছিমন, ভ্যানগাড়ি নিয়ে শাপলা কিনতে চলে আসে। তারা নৌকা থেকে শাপলা তুলে নিদির্ষ্ট পরিবহনে করে ছুটে চলে শহরের বাজারসহ বিভিন্ন স্থানে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, মাদারীপুর জেলার রাজৈর উপজেলা ও  গোপালগঞ্জ জেলার কোটালীপাড়া উপজেলার অংশ নিয়ে প্রায় সাড়ে ৫ হাজার হেক্টর আয়তনের বাঘিয়ার বিল জুড়ে বিশাল শাপলা রয়েছে। এছাড়াও গোপালগঞ্জের মুকসুদপুর, কাশিয়ানী, সদর উপজেলায় প্রায় ১১ হাজার হেক্টর আয়তনের জলাভূমি চান্দা বিল রয়েছে। যা দক্ষিণ অঞ্চলসহ দেশের অন্যতম বৃহত্তম বিল হিসেবে পরিচিত।
কয়েকশ বছরের পুরোনো বাঘিয়ার বিল ও চান্দার বিলে প্রায় ৯ মাসেই থাকে জলাবদ্ধ। ফলে এই বিলে শাপলার পাশাপাশি শামুক ও নানাজাতের দেশিয় মাছ বিক্রি করেও অনেকেই জীবিকা নির্বাহ করে থাকে।
তবে বছরের জ্যৈষ্ঠ থেকে কার্তিক মাস পর্যন্ত প্রচুর পরিমাণে প্রাকৃতিকভাবেই শাপলা জন্মায়। ঐ শাপলা বিল থেকে তুলে জীবিকা নির্বাহের জন্য প্রায় অর্ধশত গ্রামের সহস্রাধিক মানুষ জীবিকা নির্বাহ করে।
বিল অঞ্চলের মানুষদের সাথে কথা বলে জানা গেছে, এই অঞ্চলের হতদরিদ্র পরিবারের সদস্যরা বিল থেকে শাপলা তুলে আনে। তাদের কাছ থেকে পাইকাররা অল্পদামে শাপলা কিনে দেয়। এরপর পাইকাররা নছিমন বা ভ্যানগাড়িতে করে মাদারীপুরের রাজৈর, টেকেরহাট বন্দর এবং গোপালগঞ্জের মুকসুদপুরসহ পাশর্^বতী জেলা শহরের পাইকাররা কিনে নিয়ে যায়। সেখান থেকে খুচরা কাঁচামাল ব্যবসায়িরা শহরসহ আশেপাশের বাজারগুলোতে বিক্রি করে।
তবে অনেক পরিবার আছে তারা বিল থেকে শাপলা তুলে বেশি লাভের আশায় নিজেরাই স্থানীয় বাজারগুলোতে বিক্রি করে। ১০ থেকে ১৫টা শাপলা এক সাথে বেধে ৫টাকা আর শহরগুলোতে ১০ টাকা করে বিক্রি করতে দেখা যায়।
রাজৈরের টেকেরহাট বন্দরের শাপলা বিক্রি করতে আসা সুমন ঘরামী, কার্তিক চন্দ্র ধরসহ একাধিক ব্যবসায় জানান, বর্ষা মৌসুমে প্রতিদিন খুব ভোরে, অনেকেই ভোররাতেও বিল থেকে শাপলা তুলতে আসে। আমাদের মতো কয়েকশত মানুষ বাঘিয়ার বিল, চান্দার বিলসহ পার্শ¦বর্তী ছোট ছোট বিল থেকে শাপলা তুলে এনে হাট-বাজারে অথবা পাইকারদের কাছে বিক্রি করে।
স্থানীয়রা জানান, বাঘিয়ার বিল, চান্দার বিল ছাড়াও পাশর্^বর্তী অনেক ছোট ছোট বিল আছে। যেমন গোপালগঞ্জের বড়বিল, মোল্লাার বিল, সিঙ্গার বিল এবং মাদারীপুর রাজৈরের মহিষমারীর বিল, কদমবাড়ির বিল, লখন্ডার বিল থেকেও প্রতিদিন  লোকজন প্রচুর শাপলা তুলে বিক্রি করে জীবিকা নির্বাহ করে থাকে। এখানকার শাপলা মাদারীপুর, ফরিদপুর, বাগেরহাট, নড়াইল, খুলনা, বরিশাল এমনকি ঢাকার বিভিন্ন হাট-বাজারেও পাইকাররা বিক্রির জন্য নিয়ে যায়।
রাজৈরের সীমা বেগম, মাদারীপুর শহরের ইসরাত জাহান, মুকসুদপুরের শিউলী বেগমসহ একাধিক গৃহবধূ জানান, বর্ষা মৌসুমে শাপলা সহজেই পাওয়া যায়। দামেও কম। তাই সবজি হিসেবে খাদ্য তালিকায় এই এলাকার মানুষজন রান্না করে খায়। সরিষাবাটা দিয়ে শাপলা ভাজি, ডাল ও মাছের সাথেও খাওয়া যায়। তবে বেলে মাছ, ইলিশ মাছ ও চিংড়ি মাছের সাথে শাপলা তরকারি রান্না করলে খুবই সুস্বাদু হয়।
মাদারীপুর পরিবেশবাদী সংগঠন ফ্রেন্ডস অভ নেচারের সহ-সম্পাদক আয়শা সিদ্দিকা বলেন, বর্তমানে কৃষকরা অত্যাধিক পরিমাণে রাসায়নিক সার ও কীটনাশক ব্যবহার করায় জলাভূমির জীববৈচিত্র্য ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। ফলে অন্য উদ্ভিদের মতো জলজউদ্ভিদ শাপলার উৎপাদনও দিন দিন কমে যাচ্ছে। তবে এ ব্যাপারে সরকারীভাবে ও পাশাপাশি বেসরকারী সংস্থাগুলো যদি এগিয়ে আসে, তাহলে আর্থিক উন্নয়নের জন্য এই বিল দুটো দেশের মধ্যে উদাহরণ হতে পারে।
মাদারীপুর জেলা দুর্নীতি প্রতিরোধ কমিটির (দুপ্রক) সাধারণ সম্পাদক শাহজাহান খান বলেন, শুধু শাপলা নয়, এই বিলে এক সময় প্রচুর মাছ ও শামুক পাওয়া যেতো। যা বেচে ঐ অঞ্চলের অধিকাংশ মানুষ জীবিকা নির্বাহ করতো। জলজ প্রাণবৈচিত্র্যে ভরা ছিল এই বাঘিয়ার বিল। পরিবেশ ও প্রকৃতির পরিবর্তনের কারণে এখন তা বিলুপ্তির পথে।
মাদারীপুর উন্নয়ন সংস্থা দেশগ্রামের নির্বাহী পরিচালক এবিএম বজলুর রহমান মন্টু খান বলেন, এক সময় দক্ষিণ অঞ্চলের সবচেয়ে বড় নৌকাবাইচ হতো বাঘিয়ার বিল ও চান্দার বিলে। এখন আর সেই নৌকাবাইচ চোখে পড়ে না। তবে বর্ষা মৌসুমে প্রচুর শাপলা জন্মানোর জন্য আজও এই বিল তার নিজস্ব ঐতিহ্য ধরে রেখেছে।
মাদারীপুরের সাংস্কৃতিককর্মী লেখক সুবল বিশ্বাস বলেন, মাত্র কয়েক বছর আগেও জীববৈচিত্র্যে ভরা ছিলো এই বাঘিয়ার বিল। শাপলা, শালুক, শোলা, ধইঞ্চা, কলমি, কচুরিপানা, মালঞ্চ, হেলেঞ্চা, বিভিন্ন ধরনের কচুসহ নানা জলজ উদ্ভিদ ও কৈ, শিং, মাগুর, চিতল, শোল, গজার, খলিসা, পুটিসহ নানা জাতের মাছে ভরা ছিলো এই বিল। যা বিক্রি করে ঐ এলাকার মানুষ জীবিকা নির্বাহ করতো। এছাড়াও চিল, শালিক, বাবুই, টুনটুনি, বক, মাছরাঙা, বুনোহাঁস, পানকৌড়ি, ডাহুকসহ নানা জাতের পাখির আনাগোনায় প্রাকৃতিক সৌন্দর্য্যে ভরপুর থাকতো এই বিল অঞ্চল। এখন আর সেই দৃশ্য চোখে পড়ে না। তবে এখনও বর্ষা মৌসুমে বিলজুড়ে প্রচুর শাপলা দেখা যায়। যা বিক্রি করে এই অঞ্চলের বহু পরিবার জীবিকা নির্বাহ করে।