মঙ্গলবার , ২৬ সেপ্টেম্বর ২০১৭
Home » জাতীয় » আশ্রিত রোহিঙ্গাদের কারণে ঝুঁকিতে প্রাকৃতিক পরিবেশ

আশ্রিত রোহিঙ্গাদের কারণে ঝুঁকিতে প্রাকৃতিক পরিবেশ

Rohinga Env

সিনিউজ: সাম্প্রতিক সময়ে ৩ লক্ষাধিকসহ এ পর্যন্ত আশ্রিত সাত লাখ রোহিঙ্গার কারণে ব্যাপক ঝুঁকিতে আছে কক্সবাজারসহ উপকূলীয় জেলাগুলোর পরিবেশগত ও সামাজিক অবস্থা। বিপুল সংখ্যক শরণার্থীদের শৃঙ্খলায় আনতে হিমসিম খেতে হচ্ছে সংশ্লিষ্ট দায়িত্বপ্রাপ্তদের। ভাষাগত ও অন্যান্য সমস্যার কারণে রোহিঙ্গারা অনুসরণ করতে পারছেনা প্রশাসন ও দায়িত্বপ্রাপ্তদের নির্দেশনা। যত্রতত্র রান্নাবান্না, মলমূত্রত্যাগ, খোড়াখুড়ি, আগুন জালানো ইত্যাদি কারণে ব্যাপক বিপর্যয়ের মুখে পরিবেশত ভারসাম্য। এদিকে কড়া নজরদারী না থাকায় স্থানীয় সুবিধাবাদী ও টাউট-বাটপারদের মাধ্যমে অনেক রোহিঙ্গা মিশে যাচ্ছে সাধারণ জন স্রোত। ফলে বেড়ে যাচ্ছে সামাজিক অপরাধ বৃদ্ধির আশংকা। বন ধ্বংস, পাহাড়কাটাসহ ব্যাপক পরিবেশ বিপর্যয়ের আশংকাও রয়েছে বলে মনে করছেন পরিবেশবিদরা।
কক্সবাজারের টেকনাফের মৌচনি, লেদা, উখিয়া, উপজেলার কুতুপালংসহ জেলার জুড়ে বন বিভাগের জমিতে প্রতিদিন অনুপ্রবেশ করা রোহিঙ্গরাও পাহাড়ি জমি দখল করে কোন না কোন জায়গায় বসতি গড়ে তুলছে। কয়েক বছরের ব্যবধানে এই রোহিঙ্গা শিবিরের আশে পাশে আরও কয়েক হাজার একর সংরক্ষিত পাহাড় দখল করে অবৈধ বসতি করছে কয়েক লাখ অনুপ্রবেশকারী রোহিঙ্গা। এখন তাদের নিয়ন্ত্রন না করলে এই জেলায় তাদের কারণে স্থানীয়রা বসবাস করাও অনেকটা দুর্বিসহ হয়ে ওঠবে। সম্প্রতি উখিয়ার ঘাট বন বিটের আওতাধিন সৃজিত ৩০ হেক্টর জমির উপর রোহিঙ্গারা দখল করেছে। ক্ষতিগ্রস্থ ৭৫ জন সামাজিক বনায়নের উপকারভোগী বন ও পরিবেশ মন্ত্রণালয়ের সচিব ও কক্সবাজার জেলা প্রশাসক বরাবরে স্বারক লিপি দিয়েছে বলে জানাগেছে। তাদের দাবী রোহিঙ্গরা বন বিভাগের জমি প্রতিদিন শত শত একর নিয়ে নিচ্ছে খাচ্ছে। নির্মাণ করছে বসত ঘর, মসজিদ, দোকান ঘর সহ নানা স্থাপনা। বিশেষ করে সামাজিক বনায়নের জমি দখল করায় ক্ষতির শিকার হয় এইসব সামাজিক বনায়নের উপকারভোগিরা।
সূত্র জানায়, টেকনাফের নয়াপাড়া শরণার্থী শিবিরের পাশে রয়েছে আরও ৩০ হাজার রোহিঙ্গার বিশাল বসতি। এ ছাড়া জেলার সমুদ্র উপকূলের হিমছড়ি, বড়ছড়া, বাহারছড়া, মনখালী, ঝাউবাগান ও কক্সবাজার পৌরসভার ভেতর কয়েকটি পাহাড় এবং উখিয়া, টেকনাফ, রামু, চকরিয়া উপজেলায় বসবাস করছে আরও অন্তত আড়াই লাখ রোহিঙ্গা। এসব রোহিঙ্গা সরকারি বন-জঙ্গল উজাড়ের পাশাপাশি আয়-রোজগারের জন্য হামলে পড়ছে শহরের এদিক-সেদিক। অনেকে চুরি, ডাকাতি, ছিনতাইসহ নানা অপরাধকর্মে জড়িয়ে পড়ছে। ফলে রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বিগ্ন জেলার ২৪ লাখ মানুষ।
নতুন করে বাংলাদেশে প্রবেশ করা রোহিঙ্গাদের অধিকাংশই কক্সবাজারের উখিয়া উপজেলার বিভিন্ন বন ও পাহাড়ে আশ্রয় নিয়েছেন। তাদের কেউ কেউ ঝুঁকিপূর্ণ হলেও পাহাড়ে বিভিন্ন স্থান থেকে বাঁশ এনে পলিথিনের ছাউনি দিয়ে তৈরি করছেন টং ঘর। বনবিভাগের যেসব জায়গায় স্থানীয়দের তেমন যাতায়াত নেই, সেসব জায়গাতেই তারা গড়ে তুলছেন এসব বসতি। উখিয়ার বিভিন্ন এলাকায় বনবিভাগের সামাজিক বনায়নের আওতাধীন এলাকা ও পাহাড় কেটে রোহিঙ্গাদের ঘর তৈরি করতে দেখা গেছে।
উখিয়ার কুতুপালং রোহিঙ্গা ক্যাম্পের অদূরে বালুখালীর একাধিক পাহাড়ে মংডু থেকে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গারা ঘর তৈরি করছে। দীর্ঘ এলাকা নিয়ে তারা তৈরি করছে ছোট ছোট ঘর। পাহাড় ছাড়াও অনেক রোহিঙ্গা বিচ্ছিন্নভাবে উখিয়ার সামাজিক বনায়ন প্রকল্পের ভেতরে পলিথিন ও বাঁশ দিয়ে ঘর তৈরি করে থাকছেন। উখিয়া উপজেলা থেকে বান্দরবান যাওয়ার পথে মাইলের পর মাইলজুড়ে চোখে পড়ে শরণার্থী রোহিঙ্গাদের সারি। তাদের কেউ রাস্তার পাশে, কেউ গাছে বসে বা শুয়ে আছেন। অনেকে অসুস্থও হয়ে পড়েছেন।
বনকর্মীদের যোগসাজসে কক্সবাজার সমুদ্র সৈকতের টেকনাফ শামলাপুর পয়েন্টে উচ্ছেদ করা ঝাউবাগানেহাজার হাজার গাছকে কেটে হত্যা করা হয়েছে। ২০০২ ও ২০০৩ সালে উপকূলীয় জনগণের স¤পদ রক্ষায় শামলাপুর থেকে শাহপরীরদ্বীপ পর্যন্ত ৭‘শ একর বালুচরে দশ লাখের মতো ঝাউগাছ রোপন করা হয় যা এখন নিধনের পথে। এদিকে সম্প্রতি শামলাপুরের দেড় কিলোমিটার ঝাউবাগানে প্রায় আড়াই হাজার রোহিঙ্গা পরিবার বসতি শুরু করে।
কক্সবাজার থেকে উখিয়া হয়ে টেকনাফ যাওয়ার পথে দুচোখ যেদিকে যায় সবদিকে এখন রোহিঙ্গাদের অবস্থান। রাস্তার পাশে যেমন তারা রয়েছেন তেমন বন জঙ্গলেও অবস্থান নিয়েছেন রোহিঙ্গারা। পাশাপাশি রাস্তার দুপাশে বনবিভাগের পাহাড় টিলাগুলোতে রোহিঙ্গারা নতুন করে বসতি স্থাপন শুরু করেছে। রোহিঙ্গা শরণার্থী শিবির খুঁজতে এখন আর বেশি দূর যেতে হয় না। কক্সবাজারের টেকনাফ ও উখিয়া এখন অলিখিত ভাবে রোহিঙ্গা শিবিরে পরিণত হয়েছে।
এদিকে কক্সবাজারের টেকনাফ, উখিয়া, রোমাসহ বিভিন্ন এলাকায় কয়েক দিন ধরে আসা প্রায় ৪ লাখ রোহিঙ্গার অনেকে এখন দেশের মূল জন স্রোতের সঙ্গে মিশে যাচ্ছে বলে জানিয়েছে স্থানীয় বাসিন্দারা। স্থানীয় কিছু দালাল শ্রেণির লোক চট্টগ্রাামসহ বিভিন্ন জেলায় রোহিঙ্গাদের ছড়িয়ে পড়ার ক্ষেত্রে সহযোগিতা করছে বলে প্রশাসনসূত্রে জানা গেছে। গত দুই দিনে শুধু কক্সবাজার-টেকনাফের লিঙ্ক রোডের মুখে চেকপোস্ট বসিয়ে দুই শতাধিক রোহিঙ্গা শরণার্থীকে আটক করা হয়েছে। তারা মিনিবাস ও বিভিন্ন ছোট ছোট যানবাহনে করে চট্টগ্রাম অভিমুখে যাওয়ার উদ্দেশে ওই পথ দিয়ে আসছিল।