বুধবার , ২৪ জানুয়ারি ২০১৮
Home » ফিচার » নারীর গোলাপি রং পছন্দের রহস্য

নারীর গোলাপি রং পছন্দের রহস্য

pink

pink

সি নিউজ : রং পছন্দের ক্ষেত্রে ব্যক্তিভেদে ভিন্নতা থাকাটা স্বাভাবিক। তবে অধিকাংশ মেয়ের পছন্দের রং গোলাপি। কিন্তু কেন? নারী এবং গোলাপি রঙের মধ্যে এই সম্পর্কের কোনো বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা আছে কি? বহু বছর ধরে এই প্রশ্ন ঘুরপাক খেয়েছে সবার মাথায়।
২০১৭ সালের আগস্ট মাসে প্রকাশিত ‘কারেন্ট বায়োলজি’র এক গবেষণানুসারে, মেয়েদের গোলাপি রং পছন্দের ব্যাপারটা পুরোপুরি সামাজিক কিংবা বাণিজ্যিক নয়। এর পেছনে আছে মানসিক এবং শারীরিক কিছু ব্যাপারও। ছেলেদের চেয়ে একটু বেশি লালচে রং পছন্দ নারীদের জন্মগতভাবেÑ এমনটাই বলা হয় সেখানে। নিউক্যাসল বিশ্ববিদ্যালয়ের স্নায়ুবিজ্ঞানী এনিয়া হার্লবার্ট এবং ইয়াজু লিং ২০-২৬ বছরের মোট ২০৮ জনের ওপরে রং নির্বাচন পরীক্ষা চালান। অংশগ্রহণকারীদের বলা হয়, খুব দ্রুত কার্সর ঘুরিয়ে কয়েকটি রং, কয়েক শেডের রং, আলো এবং অন্ধকারের মিশেলে রং, বিভিন্ন আকৃতিতে থাকা রঙের মধ্য থেকে নিজের পছন্দের রংটি বাছাই করতে। সপ্তাহ দুয়েক পর আবার তাদের নিয়ে একই পরীক্ষা করা হয়।
গবেষণা থেকে জানা যায়, প্রায় সব মানুষই সাধারণত নীল রং পছন্দ করে। তবে ছেলেরা যে ক্ষেত্রে নীলের সাথে সবুজের মিশ্রণ পছন্দ করে, সেক্ষেত্রে মেয়েরা একটু লালচে রঙের নীল পছন্দ করে। অনেকটা বেগুনি ধাঁচের রং এগিয়ে থাকে তাদের পছন্দের তালিকায়। নিজেদের সংস্কৃতির কারণে রঙের পছন্দ ভিন্ন হতে পারে- সেই কথা মাথায় রেখে এই পরীক্ষায় রাখা হয়েছিল বেশ কয়েকটি সংস্কৃতির মানুষকে। তাদের মধ্যে ছিল চীনের হান চাইনিজদের ৩৭ জন, ব্রিটিশ ককেশিয়ানদের মধ্যে ১৭১ জনÑ এদের সবাই নারী এবং পুরুষের রং নির্বাচনের ক্ষেত্রে এই ভিন্নতা অনুভব করেছেন। অবশ্য চীনাদের মধ্যে লালের দিকে ঝোঁকটা ছিল বেশি।
নারীরা পুরুষদেও চেয়ে রঙের আভা ভালো বুঝতে পারে। এই ক্ষমতা আজকের নয়, বরং বছরের পর বছর ধরে অভ্যাসের ফলে তৈরি হয়েছে বলে মনে করেন গবেষকেরা। প্রাচীনকালে পুরুষেরা শিকারে যেত। আর নারীরা ফল পেড়ে আনত, বাচ্চা লালন-পালন করত। এসব কারণে কোন ফল পেকেছে, কোন ফলের গায়ে লালচে আভাস দেখা যাচ্ছে- এসব পুরুষের চেয়ে ভালোভাবে দেখতে শুরু করে নারীরা। অন্যদিকে শিশুর যত্ন নিতে গিয়ে তাদের বুঝতে হতো যে, শিশুর গালে আভা কতটুকু লালচে হলে বুঝতে হবে তার শরীর খারাপ। আর অভ্যাসের কারণের রং এবং রঙের মিশ্রণ পুরুষের চেয়ে অধিকতর পরিষ্কারভাবে দেখতে শুরু করে নারীরা, যার প্রভাব যায়নি এখনো। তাই অনেক সময় পুরুষেরা গোলাপি রং হালকা বিধায় সেটাকে খুব ভালো করে দেখতে এবং পছন্দ করতে পারে না। তাদের দরকার পড়ে গাঢ় কোনো রঙ। সত্যিই তো, যে রঙের পুরোটা রূপ আপনি উপভোগ করতে পারছেন না, সেটা আপনার ভালো না-ই লাগতে পারে!
তবে এ তো গেল একপক্ষের কথা। শারীরিক ও মানসিক গঠনকে নারী ও গোলাপি রঙের কাছাকাছি আসার কারণ বলে অনেকে মনে করলেও এর বাণিজ্যিক ও সামাজিক দিকের কথাও কিন্তু বাদ দেয়ার মতো নয়। ১৯১৮ সালে ‘আর্নশ’স ডিপার্টমেন্ট’-এর এক আর্টিকেলে বলা হয়, নীল রং দৃঢ়তা আর শক্তির প্রতীক হওয়ায় মেয়েদের জন্য গোলাপি রংকেই বেছে নেয়া উচিত। অন্যদিকে গোলাপি বলতেই বোঝায় মায়ার ভাব, নাজুক এক প্রকাশ। তাই সেটা ছেলেদের রং হিসেবে মানানসই। ১৯৬০ সালের দিকে ছেলেমেয়েদের আলাদা আলাদা রঙের পেছনে বড় ভূমিকা পালন করে শিশুদের খেলনা তৈরিকারী প্রতিষ্ঠানগুলো। ছেলে এবং মেয়েদের জন্য নির্দিষ্ট আলাদা রঙের খেলনা বেশি তৈরি করায় সেটি ছেলে এবং মেয়েদের লিঙ্গ ভিন্নতার একটি নিদর্শন হয়ে যায়। অভিভাবকরা এই ¯্রােতে গা ভাসিয়ে দিলে রঙের ভিন্নতা খুব স্বাভাবিক একটি ঘটনা হয়ে যায়।
সবার ভেতরে এই ধারণা অনেক আগে থেকেই বদ্ধমূল হয়ে আছে যে, মেয়ে শিশুর জন্য গোলাপি রংটাই একদম ঠিকঠাক। তাই তার জন্য ছোটবেলা থেকে কিনে আনা হয় গোলাপি জামা, জুতা, খেলনা। আশপাশে নারীদের মুখেও থাকে গোলাপি রঙের প্রতি আকর্ষণের গল্প। এতকিছু শুনতে শুনতে নিজের পছন্দের রঙের জায়গায় গোলাপিকে বসিয়ে দেয়াটা খুব একটা অস্বাভাবিক কিছু নয়। গোলাপির বদলে রংটা যদি হতো খয়েরি, তবে নারী শৈশব থেকেই যদি পরিচিত হতো খয়েরির সাথে, তাহলে হয়তো সেটাকেই বেশি পছন্দ হতো তার।
গবেষকদের মতে, দুই বছর বয়স থেকেই মেয়েরা গোলাপি রঙের দিকে ঝুঁঁকতে থাকে। আর ঠিক তার কাছাকাছি কোনো একটি বয়স থেকেই গোলাপি রংকে সতর্কতার সাথে দূরে সরিয়ে রাখতে শুরু করে ছেলেরা। সেদিক দিয়ে বলতে গেলে, এই আচরণ থেকে বোঝাটা খুব স্বাভাবিক যে, জন্মগতভাবে নয়, বরং জন্মাবার বেশ কিছুদিন পর চারপাশের মানুষের এবং সমাজের মনমানসিকতা দ্বারা প্রভাবিত হয়েই এমন রং বেছে নেয় মেয়েরা। তাই পছন্দের রং এখানে কোনো বড় ব্যাপার নয়। আসল ব্যাপার হলো চারপাশের পরিবেশ। পরিবেশ যে ধারণা একটি শিশুকে ছোটবেলা থেকে দিয়ে আসবে, সে সেটাই তো করবে। ইচ্ছা করে গোলাপি রঙের পোশাক পরে কোনো ছেলেশিশু নিশ্চয়ই নিজেকে মেয়েলি বলে প্রমাণ করতে চাইবে না। সেই সাথে, কোনো মেয়ে নিশ্চয়ই চারপাশের সবার চাইতে আলাদা হয়ে উঠতে চাইবে না। গোলাপিতে তাকে মানায়, সুন্দর দেখায়, গোলাপিই তার পছন্দনীয় রং সেটা ভাবতে অনেকটাই বাধ্য সে।
তাহলে প্রশ্ন ওঠে, নারী এবং গোলাপি রং- এ দুটোর সম্পর্কটা ঠিক কী? প্রশ্নের উত্তর পেতে হলে নিরপেক্ষভাবে ভাবতে হবে আপনাকে। গোলাপি রং আর দশটা রঙের মতোই একটি রং। একজন মানুষ, নারী ও পুরুষভেদে, গোলাপি রংটিকে পছন্দ করতেই পারেন। তার মানে এই নয় যে, তাকে নারী হতে হবে। তবে সামাজিক প্রভাবে ইতিহাসে বারকয়েক হাতবদল হয়ে গোলাপি এখন হয়ে উঠেছে নারীদের রং। তবে একটি ব্যাপার সঠিক যে, গোলাপি মানুষকে আকর্ষণ করে বেশি। নীল যদি সবার পছন্দের হয়, তবে গোলাপিও কম যায় না। ২০০২ সালে সুইজারল্যান্ডে একটি গবেষণায় পাওয়া যায় যে, কাগজে গোলাপি রং দিলে মানুষ লিফলেট কিংবা ফর্মের প্রতি বেশি আগ্রহী হয়ে ওঠে। যেটা কিনা অন্য কোনো রঙের ক্ষেত্রে হয় না!