বুধবার , ২৪ জানুয়ারি ২০১৮
Home » লাইফস্টাইল » বিশ্বজুড়ে জনপ্রিয় ইতালীয় খাবার পাস্তার ইতিহাস

বিশ্বজুড়ে জনপ্রিয় ইতালীয় খাবার পাস্তার ইতিহাস

Pasta

Pasta

সি নিউজ : বিশ্বব্যাপী জনপ্রিয় ইতালির এক খাবারের নাম পাস্তা। এর রয়েছে নানান ধরন ও বাহারি স্বাদ। পাস্তা ইতালীয় খাদ্যজগতের এক অন্যতম ঐতিহ্যবাহী খাবার। পাস্তার প্রথম উল্লেখ পাওয়া যায় ১১৫৪ সালের সিসিলিতে। পাস্তা সাধারণ অর্থে দুরুম গমের আটা, পানি অথবা ডিম মিশিয়ে তৈরি খামির থেকে নানান আকৃতিতে তৈরি নুডলস বিশেষ, যা পরবর্তীতে ফুটিয়ে কিংবা বেক করে রান্না করা হয়। পাস্তা মূলত দুই প্রকারের হয়ে থাকে- টাটকা পাস্তা এবং শুষ্ক পাস্তা। মার্কো পোলো চীন থেকে পাস্তা নিয়ে ইতালি এসেছিলেন জনশ্রুতি থাকলেও এটি সত্য নয়। প্রকৃতপক্ষে, পাস্তা ইতালীয়দেরই উদ্ভাবন এবং এর প্রতি তাদের একাগ্র নিবেদনই রন্ধনশিল্পে একে তাদেও নৈপুণ্য ও গর্বের প্রতীক হিসেবে স্থান করে দিয়েছে।
টাটকা পাস্তার আঁতুড়ঘর হিসেবে চিহ্নিত করা হয় প্রাচীন রোমকে, সেখানে সুজিতে পানি যোগ করে তা থেকে পাস্তা বানানো হতো। বর্তমানে বাজারে সহজলভ্য শুষ্ক পাস্তার সাথে সে পাস্তার একটি তফাত এই ছিল যে, টাটকা পাস্তা বানিয়ে ফেলার পরপরই তা রান্না করে খেয়ে ফেলা হতো। ৮ম শতাব্দীতে আরবদের সিসিলি আক্রমণের সময়কেই শুষ্ক পাস্তার উদ্ভবকাল বলে মনে করা হয়। নতুন ধরনের পাস্তা হিসেবে আগত এই শুষ্ক পাস্তার বিপুল উৎপাদন শুরু হয় ইতালির দক্ষিণের শহর পালের্মোতে। এখনো পাস্তার কিছু কিছু রেসিপিতে আরবদের প্রভাব লক্ষ্য করা যায়, যার মধ্যে কিশমিশ ও দারুচিনির ব্যবহার উল্লেখযোগ্য।
১৩০০ সালের দিকে শুষ্ক পাস্তার দীর্ঘমেয়াদি সংরক্ষণ করার সুবিধা এবং পুষ্টিগুণের জন্য লম্বা সমুদ্রযাত্রায় ব্যবহারের ক্ষেত্রে বেশ জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। বলাবাহুল্য, এই সব সমুদ্রযাত্রা দেশ-বিদেশে পাস্তার পরিচিতি ও আবেদনে ভূমিকা রাখতে সক্ষম হয় এবং পাস্তার গঠন ও তৈরিতে ব্যবহৃত প্রযুক্তিতে অগ্রসরমান প্রভাব আনতে সমর্থ হয়। এদিকে ইতালিতে পাস্তা তখন তার অগ্রযাত্রা বজায় রেখে ধীরে ধীরে উত্তরে নেপলসের দিকে অগ্রসর হচ্ছিল। সপ্তদশ শতকে এটি নেপলসে জেঁকে বসতে সক্ষম হয়।
কিছু রাজনৈতিক ঘটনাপ্রবাহ পাস্তাকে একপ্রকার জাতীয় আইকনে পরিণত করে। ১৮৬০ সালের মাঝামাঝি সময়ে ইতালীয় একীভবন এর সময় এটি মুখ্য খাবারের একটিতে পরিণত হয়। পরবর্তীতে ইতালীয় সামরিক ও রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব জিউসেপ গ্যারিবল্ডি ১৮৯১ সালে পেল্লেগ্রিনো আরটুসির লেখা ‘লা স্কিয়েনজা ইন কুসিনা’ নামক বইটির সাথে দেশের মানুষকে পরিচিত করান, বইটি লেখা হয়েছিল পাস্তাকে কেন্দ্র করেই। ঊনবিংশ শতাব্দীতে ইতালিতে আগত টমেটো সসকে ইতালীয়রা শুরুতে স্বাগত জানায়নি। নাইটশেডগণের অন্তর্ভুক্ত টমেটোকে অনেক এলাকায় খাবার হিসেবে গ্রহণের অযোগ্য বিবেচনা করা হতো, তবে ধীরে ধীরে এই ভুল ধারণা কেটে যায়। পাস্তায় এর ব্যবহার হতে বাধা থাকে না। পাস্তার আদি ইতিহাসের শেষ উল্লেখযোগ্য ঘটনা ইতালীয় জনগণের গণদেশত্যাগের সাথে জড়িত। ইতালীয় একীভবন ও প্রথম বিশ্বযুদ্ধের মাঝামাঝি সময়ে অনেক ইতালীয় নাগরিক ইতালি ছেড়ে অন্য দেশে চলে যায়। এই সময়কার ভোগান্তি ও কষ্টগুলোই যেন ইতালীয়দের রান্নাবান্নায় নিজের নৈপুণ্য ও পারদর্শিতা ফুটিয়ে তোলার জ্বালানি হিসেবে কাজ করেছিল, যা তাদের গর্বেরও খোরাক বটে!
পাস্তা মূলত দু’প্রকার : পাস্তা ফ্রেস্কা (টাটকা, যা কিনা বানাবার পরপরই রেঁধে খেয়ে ফেলা হয়) ও পাস্তা সেক্কা (শুষ্ক)। এই দুই রকম পাস্তাকে চারশ’রও বেশি প্রকারে ভাগ করা সম্ভব, যার প্রত্যেকটিই অন্যটি থেকে কোনো না কোনোভাবে আলাদা ও অনন্য। পাতলা পাত, ফলা কিংবা লম্বা সুতোর ন্যায়, সিলিন্ডার আকৃতির, নানা আকারের ও স্বাদের এবং নানা আঞ্চলিক ধরনের পাস্তার অস্তিত্ব এই বিশ্বভ্রহ্মা-ে বিদ্যমান। এত রকমের পাস্তার ছড়াছড়ি সমগ্র পৃথিবীতে আছে যে সব কটির নামও একসাথে মনে রাখা সম্ভব নয়, যদিও ইতালীয় নিয়ম মেনে সব পাস্তাই মোটামুটিভাবে প্রায় একই মূল উপাদানে তৈরি।
মূল উপাদানগুলোর সীমারেখার বাইরে নানা উপাদান, নির্যাস ও রং সহযোগে ভিন্ন ভিন্ন পাস্তা বানানো সম্ভব। ডিমের কুসুম, পালংশাক, টমেটোর ক্বাথ, চকোলেট এমনকি স্কুইড ইঙ্ক দিয়েও পাস্তা বানানোর নজির আছে এবং এই পাস্তাগুলো সঠিকভাবে তৈরি ও পরিবেশন করা হলে এদের প্রত্যেকেরই রয়েছে নিজস্ব স্বাদ।
পাস্তার স্বাদু জগতে ডুব দেবার ক্ষেত্রে আরেকটি উল্লেখযোগ্য ও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো পাস্তার সাথে যে সসটি খাওয়া হবে। পাস্তা ও সসের যথার্থ যুগলবন্দিই পারে পাস্তাকে তার নিজ যোগ্যতায় অনন্যসাধারণ করে তুলতে। পাস্তার স্বাদ ও আবরণই অনেকটা বলে দিতে পারে যে কোন সসের সাথে এর যুগলবন্দি জমে যাবে। এক্ষেত্রে খুবই সাধারণ একটি নিয়ম মেনে চলা হয়- মোটা ভারি পাস্তার জন্য বেশি ঘন সস এবং হালকা পাস্তার জন্য পাতলা বা কম ঘনত্বের সস।
টাটকা পাস্তাই সবরকম পাস্তার মূল উৎসবিন্দু। সাধারণত উচ্চ আর্দ্রতায় এগুলো তৈরি হলেও আঞ্চলিকতার সাপেক্ষে এগুলোর নানান প্রকরণ পাওয়া যায়। উত্তর ইতালিতে পাস্তার খামির বানাতে ময়দা ও ডিম ব্যবহৃত হয় আবার দক্ষিণ ইতালিতে ব্যবহৃত হয় উৎকৃষ্ট মানের সুজি ও পানির মিশ্রণ। ইতালির সবচেয়ে ভালো মানের টাটকা পাস্তা তৈরি হয় এমিলিয়া রোম্যাগনা অঞ্চলে, সেখানে সদ্য তৈরি পাস্তা রান্না করে পরিবেশন করা হয় ক্রিম সসের সাথে। এদিকে পাস্তার আরেকটি আঞ্চলিক প্রকরণ পাওয়া যায় পিরমন্টে, যেখানে মাখন এবং ব্ল্যাক ট্রুফল (কালচে মাটির নিচে জন্মানো কন্দজাতীয় ছত্রাকবিশেষ) এর ব্যবহার প্রচলিত। এছাড়া আঞ্চলিক পরিবর্তনের সাথে সাথে পাস্তায় ব্যবহৃত উপাদানসমূহের তালিকাটাও পরিবর্তিত হতে থাকে- পাস্তায় আলু কিংবা রিকোট্টা চিজের ব্যবহারও এরই বাস্তবিক প্রভাব।
টাটকা পাস্তা বানানোর পরে পছন্দসই আকারে কেটে নেয়া হয় এবং তারপর তা খোলা বাতাসে আংশিক শুকিয়ে নেয়া হয় কিছুক্ষণ। এরপরই তা সিদ্ধ করে রান্না করা হয়।
এদিকে শুষ্ক পাস্তা তৈরির জন্য ব্যবহৃত হয় বিশেষ যন্ত্র। প্রথমে, পাস্তার খামিরকে ডাই মেশিনের (একপ্রকার কাটার যন্ত্র) ছিদ্রযুক্ত প্লেটের মধ্য দিয়ে চালনা করা হয় এবং তারপর এগুলোকে কাটার জন্য সমতলে রাখা হয়। পছন্দসই আকৃতিতে কাটার পর একে শুকানোর জন্য নেয়া হয়। শুষ্ক পাস্তাকে খাঁটি পাস্তা হিসেবে তখনই আখ্যা দেয়া যাবে যখন তা একদম পুরো ইতালীয় নিয়ম মেনে তৈরি হয়। সে অনুসারে, পাস্তাকে প্রথমে তামার পাত্রে ১৫ ঘণ্টার কিছু বেশি সময় একে আস্তে আস্তে শুকোতে দেয়া হয় এবং তারপর সেটিকে খোলা বাতাসে শুকোনো হয়। যদিও পৃথিবীর বাকি অংশগুলোতে সময় বাঁচাতে স্টিলের পাত্রে অত্যন্ত উচ্চ তাপমাত্রায় পাস্তা শুকোনো হয়, কিন্তু এতে সময় বাঁচলেও যে উৎপাদিত পণ্য পাওয়া যায় তা অপেক্ষাকৃত নিম্নমানের। ইতালীয়রা তাদের পাস্তা বানানোর ধরন ও স্বাদ নিয়ে গর্বিত, তাদের পাস্তার দ্রুত রান্না হওয়ার গুণ এবং সসের সাথে এর চমৎকার রসায়নে তারা গর্বিত হতেই পারে।